বাংলাদেশে কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা শনাক্ত করা এবং বেনামে শেয়ার ধারণ করে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া বন্ধ করতে কোম্পানি আইন সংশোধন-এর উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে প্রকৃত মালিকানা (Beneficial Ownership) প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের বদলে RJSC-এর অনুমোদন, অনলাইনে নথি সংরক্ষণ, নামসংক্রান্ত জরিমানা বৃদ্ধি এবং এক ব্যক্তির কোম্পানি (OPC)-সংক্রান্ত বিধান হালনাগাদের কথা বলা হয়েছে।
Read in English: Companies Act Amendment 2026 →১. কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ কেন
বাংলাদেশে কোম্পানি গঠন, পরিচালনা ও অবসায়নের মূল আইন হলো কোম্পানি আইন, ১৯৯৪। আইনটি প্রয়োগ করে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (RJSC)। আইনটি প্রণয়নের পর কয়েকবার ছোটখাটো সংশোধন হলেও বড় পরিবর্তন হয়নি। অথচ এই সময়ে ব্যবসার ধরন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ কাঠামো এবং অর্থ পাচার প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনেক বদলে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া মতামতের জন্য প্রকাশ করে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতামত সংগ্রহ করে এফবিসিসিআই, এবং ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ অংশীজনদের সঙ্গে সভা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খসড়ার কয়েকটি প্রস্তাব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি।
অক্টোবরের শেষে প্রথম আলোসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানায়, খসড়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আইনের প্রায় ৪০টি ধারায় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কোম্পানি আইন সংশোধন-এর তিনটি মূল লক্ষ্য:
- স্বচ্ছতা: প্রতিটি কোম্পানির প্রকৃত মালিক শনাক্ত করা এবং বেনামি নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা।
- ব্যবসা সহজীকরণ: আদালতের অনুমোদন লাগে এমন কিছু কাজ RJSC-এর হাতে দেওয়া।
- ডিজিটাল প্রশাসন: ইলেকট্রনিক নথি, ফরম, নোটিশ ও যাচাই ব্যবস্থা চালু করা।
২. কোম্পানি আইন সংশোধনে প্রকৃত মালিকানা বলতে কী বোঝায়
কোম্পানির সদস্য রেজিস্টারে দেখা যায় কার নামে শেয়ার আছে। কিন্তু কাগজে যাঁর নামে শেয়ার, বাস্তবে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ সব সময় তাঁর হাতে থাকে না। যিনি প্রকৃতপক্ষে কোম্পানির মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ ভোগ করেন, তাঁকেই বলা হয় প্রকৃত মালিক (Beneficial Owner)।
উদাহরণ: ক নামের একজন ব্যক্তি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে খ-এর নামে কোম্পানির শেয়ার কিনলেন। কাগজপত্রে খ শেয়ারহোল্ডার। কিন্তু টাকা দিয়েছেন ক, লভ্যাংশ পান ক, আর কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও নেন ক। এখানে ক প্রকৃত মালিক, আর খ নমিনি বা বেনামি শেয়ারধারী।

এ ধরনের গোপন মালিকানা শনাক্ত করা কঠিন হলে অর্থ পাচার, কর ফাঁকি, সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে ঋণখেলাপ এবং স্বার্থের সংঘাত ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে এফএটিএফ (FATF)-এর সুপারিশেও কোম্পানির প্রকৃত মালিকানার সঠিক তথ্য সংরক্ষণের কথা বলা আছে।
প্রস্তাবিত নতুন ধারা ৩৪(ক) অনুযায়ী শুধু কাগজে-কলমে শেয়ারধারী ব্যক্তিই নন, বরং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোম্পানির মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিকেও প্রকৃত মালিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করেছে। যেমন যুক্তরাজ্যে কোম্পানিগুলোকে ‘উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি’-র রেজিস্টার রাখতে হয়, আর ভারত ও সিঙ্গাপুরেও প্রকৃত মালিকের তথ্য নিবন্ধকের কাছে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে ব্যাংকগুলো বিএফআইইউ-এর নির্দেশনা অনুযায়ী হিসাব খোলার সময় প্রকৃত মালিকের তথ্য নেয়, কিন্তু কোম্পানি আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট বিধান না থাকায় সরকারি নিবন্ধনে সেই তথ্য পাওয়া যায় না। প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন সংশোধন এই ফাঁক পূরণ করতে চায়।
৩. কোম্পানি আইন সংশোধনের ৬টি প্রধান প্রস্তাব

ক. প্রকৃত মালিকের তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক (ধারা ৩৪ক)
এটিই এবারের কোম্পানি আইন সংশোধন-এর কেন্দ্রবিন্দু। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রস্তাবিত বিধান হলো:
- কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম, পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে;
- মালিকানা পরিবর্তন হলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে;
- নির্ধারিত ফরমে তথ্য কোম্পানি নিবন্ধকের (RJSC) কাছে জমা দিতে হবে;
- তথ্য প্রকাশে ব্যর্থ হলে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা জরিমানা হতে পারে;
- ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত ১০০ টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের খসড়া নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকৃত স্বার্থ নেই এমন নিবন্ধিত শেয়ারহোল্ডারকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে, প্রকৃত মালিকানা গোপনকারী সংশ্লিষ্ট শেয়ারের ওপর আইনগত অধিকার হারাতে পারেন, এবং আইনানুগ অনুরোধে বিএফআইইউ, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার তথ্য দিতে হবে। এই পরিবর্তন কার্যকর হলে অন্যের নামে শেয়ার রেখে প্রকৃত মালিকানা গোপন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
খ. সংঘস্মারক সংশোধনে আদালতের পরিবর্তে RJSC-এর অনুমোদন
বর্তমানে কোম্পানির সংঘস্মারক (Memorandum of Association) সংশোধনের কিছু ক্ষেত্রে, যেমন ব্যবসার উদ্দেশ্য পরিবর্তন বা সম্প্রসারণে, হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এতে সময় ও খরচ দুটোই বেশি লাগে।
প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন সংশোধন-এ এসব ক্ষেত্রে RJSC-এর নিবন্ধককে অনুমোদনের ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে ব্যবসার উদ্দেশ্য পরিবর্তন, ব্যবসার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ বা নতুন ব্যবসা যুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। তবে সদস্য, পাওনাদার এবং ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এমন ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। নিবন্ধকের সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্ধারিত ফি দিয়ে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল করতে পারবেন।
গ. কোম্পানি নিবন্ধন ও নথি সংরক্ষণে ডিজিটাল ব্যবস্থা
কাগজের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় থাকতে পারে:
- ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোম্পানির রেকর্ড সংরক্ষণ;
- অনলাইনে নোটিশ, চুক্তি ও নির্ধারিত ফরম সংরক্ষণ;
- শেয়ার হস্তান্তরে ডিজিটাল মাধ্যমে স্বাক্ষর ও নথির সত্যতা যাচাই (সেপ্টেম্বরের খসড়ায় পুনঃস্বাক্ষর বা বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের কথা ছিল);
- বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের নথি দূতাবাসের মাধ্যমে সত্যায়নের ব্যবস্থা বহাল রাখা।
ঘ. কোম্পানির নামসংক্রান্ত জরিমানা বৃদ্ধি
বিদ্যমান কোনো কোম্পানির নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে মিলে যায় এমন নামে নতুন কোম্পানি নিবন্ধন করা যাবে না। সরকার নাম পরিবর্তনের নির্দেশ দেওয়ার পরও তা অমান্য করলে বর্তমানে কোম্পানির জন্য প্রতিদিন ৫০০ টাকা এবং দায়ী কর্মকর্তার জন্য ১০০ টাকা জরিমানার বিধান আছে। প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন সংশোধন-এ তা বাড়িয়ে যথাক্রমে প্রতিদিন ৫,০০০ টাকা ও ৫০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে। নাম পরিবর্তনের নিয়ম জানতে দেখুন RJSC-তে কোম্পানির নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া।
ঙ. ‘সচিব’-এর পরিবর্তে ‘কোম্পানি সচিব’
সরকারি সচিব পদের সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়াতে আইনে ‘সচিব’-এর পরিবর্তে ‘কোম্পানি সচিব’ শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের খসড়ায় তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং ৫০ কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত মূলধনের কোম্পানিতে যোগ্য কোম্পানি সচিব নিয়োগের প্রস্তাবও ছিল।
চ. এক ব্যক্তির কোম্পানি (OPC)
এক ব্যক্তির কোম্পানি বা One Person Company প্রথম চালু হয় কোম্পানি (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন, ২০২০-এর মাধ্যমে। নতুন কোম্পানি আইন সংশোধন এই কাঠামো বহাল রেখে আরও হালনাগাদ করছে, যাতে একক মালিকানার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কোম্পানি কাঠামোর আওতায় আসতে পারেন। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে OPC-কে পরে প্রাইভেট বা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরের সুযোগ থাকছে, এবং কোম্পানির ধরন অনুযায়ী নামের শেষে ‘Limited’, ‘PLC’ বা ‘OPC’ ব্যবহারের বিধান বহাল থাকছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের খসড়ায় OPC-এর ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৫ লাখ টাকা এবং সর্বোচ্চ সীমা ৫ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব ছিল।
৪. বর্তমান আইন বনাম প্রস্তাবিত কোম্পানি আইন সংশোধন
| বিষয় | বর্তমান অবস্থা | প্রস্তাবিত পরিবর্তন |
|---|---|---|
| প্রকৃত মালিকানা | প্রকৃত মালিকের তথ্য প্রকাশের সাধারণ বাধ্যবাধকতা নেই | নতুন ধারা ৩৪(ক); পরিবর্তনের ৩০ দিনে ঘোষণা |
| তথ্য না দিলে জরিমানা | নির্দিষ্ট বিধান নেই | সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা + দৈনিক ১০০ টাকা |
| সংঘস্মারকের উদ্দেশ্য পরিবর্তন | কিছু ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন | RJSC নিবন্ধকের অনুমোদন; ৩০ দিনে আপিল |
| নথি ও ফরম | মূলত কাগজভিত্তিক | ইলেকট্রনিক নথি, নোটিশ, ফরম ও যাচাই |
| নাম পরিবর্তনের নির্দেশ অমান্য | কোম্পানি ৫০০ টাকা/দিন, কর্মকর্তা ১০০ টাকা/দিন | কোম্পানি ৫,০০০ টাকা/দিন, কর্মকর্তা ৫০০ টাকা/দিন |
| পদের নাম | ‘সচিব’ | ‘কোম্পানি সচিব’ |
| এক ব্যক্তির কোম্পানি | ২০২০ সাল থেকে মূলধন ও টার্নওভারের সীমাসহ চালু | সীমা হালনাগাদ ও রূপান্তরের সুযোগ (প্রতিবেদন অনুযায়ী) |
৫. খসড়ায় আরও যেসব প্রস্তাব
সেপ্টেম্বরের খসড়া নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে আরও কিছু প্রস্তাবের কথা এসেছে। আলোচনার পর এগুলোর কিছু বদলাতে পারে, তবে এতে কোম্পানি আইন সংশোধন-এর দিকনির্দেশনা বোঝা যায়:
নিবন্ধনের তথ্য
- নিবন্ধনের সময় পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারের এনআইডি বা পাসপোর্ট, ইমেইল, মোবাইল ও টিআইএন
- প্রকৃত মালিকানার তথ্য বিনিময়ে নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম
সুশাসন
- অন্তত তিন পরিচালক নিয়ে সিএসআর কমিটি, যার একজন স্বতন্ত্র পরিচালক
- যোগ্যতা শেয়ার নেওয়ার সময় ৬০ দিনের বদলে ১২০ দিন
- অবসরপ্রাপ্ত নিরীক্ষককে এজিএমে পুনর্নিয়োগের প্রয়োজন থাকবে না
নিবন্ধন খাতা পরিচ্ছন্ন রাখা
- টানা দুই বছর নিষ্ক্রিয় বা রিটার্ন না দেওয়া কোম্পানি সহজ পদ্ধতিতে নিবন্ধন থেকে বাদ
- পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায় থেকে যাবে
- বিলুপ্ত কোম্পানির নথি ৩ বছরের বদলে ৫ বছর সংরক্ষণ
ব্যবসায়ীরা তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার বাইব্যাক, ডিজিটাল বার্ষিক প্রতিবেদন, নতুন অর্থবছরের সঙ্গে এজিএমের সময় মেলানো এবং ‘কোম্পানি গ্রুপ’-এর স্পষ্ট সংজ্ঞার দাবিও জানিয়েছেন। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, সরকার তাড়াহুড়া না করে অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করবে।
৬. কোম্পানি আইন সংশোধন কেন গুরুত্বপূর্ণ
কোম্পানি আইন সংশোধনের মূল উদ্দেশ্য হলো মালিকানা সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়ানো, গোপন নিয়ন্ত্রণ শনাক্ত করা এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রক্রিয়া সহজ করা। এটি কার্যকর হলে সম্ভাব্য সুবিধা:
- স্বচ্ছতা বৃদ্ধি: কোম্পানির প্রকৃত মালিক কে, তা শনাক্ত করা সহজ হবে।
- জবাবদিহি নিশ্চিত: শেয়ারহোল্ডার ও প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারীর তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ বাড়বে।
- ডিজিটাল সেবা: নথি সংরক্ষণ ও বিভিন্ন কাজে অনলাইন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়বে।
- ব্যবসায়িক জটিলতা হ্রাস: সংঘস্মারক সংশোধনসহ কিছু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ হবে।
- আর্থিক অনিয়ম শনাক্ত: সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সহজে মালিকানার তথ্য পাবে।
- ব্যাংক ও বিনিয়োগে আস্থা: ব্যাংকের কেওয়াইসি, ঋণ ও বিদেশি বিনিয়োগে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য পাওয়া যাবে।
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাইভেট কোম্পানিতে অন্তত দুজন শেয়ারহোল্ডার লাগে বলে অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী একটি শেয়ার স্থানীয় কোনো ব্যক্তির নামে নমিনি হিসেবে রাখেন। আবার অনেক কোম্পানির মালিক বিদেশের হোল্ডিং কোম্পানি। কোম্পানি আইন সংশোধন কার্যকর হলে এসব স্তর পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করেন, তা চিহ্নিত করে ঘোষণা দিতে হতে পারে। তবে এসব সুবিধা বাস্তবে পেতে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং RJSC-এর প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এফবিসিসিআই-ও RJSC শক্তিশালী করা এবং বেশির ভাগ সেবা অনলাইনে নেওয়ার কথা বলেছে।
একটি বাস্তব উদাহরণ
ধরা যাক, ‘এক্সওয়াইজেড বাংলাদেশ লিমিটেড’-এর দুজন নিবন্ধিত শেয়ারহোল্ডার। হংকংয়ের একটি হোল্ডিং কোম্পানির নামে ৯৯টি শেয়ার, আর ওই হোল্ডিং কোম্পানির পক্ষে নমিনি হিসেবে একজন স্থানীয় ব্যবস্থাপকের নামে ১টি শেয়ার। হংকংয়ের কোম্পানির ৭০% মালিক মিস চেন। এখানে সদস্য রেজিস্টারে হংকংয়ের কোম্পানি ও স্থানীয় ব্যবস্থাপকের নাম থাকলেও দুই স্তর পেরিয়ে প্রকৃত মালিক মিস চেন। প্রস্তাবিত বিধান অনুযায়ী তাঁর তথ্য ঘোষণা করতে হবে, আর তিনি শেয়ার বিক্রি করলে ৩০ দিনের মধ্যে নতুন ঘোষণা দিতে হবে। স্থানীয় ব্যবস্থাপকের শেয়ারের পক্ষে লিখিত নমিনি চুক্তি থাকা দরকার।
কার ওপর কেমন প্রভাব পড়তে পারে
| পক্ষ | সম্ভাব্য প্রভাব |
|---|---|
| ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা | OPC-এর সহজ শর্তে একক মালিকানার ব্যবসাকে কোম্পানিতে রূপ দেওয়ার সুযোগ; সংঘস্মারক সংশোধনে সময় ও খরচ কমতে পারে। |
| পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার | প্রকৃত মালিকানার তথ্য সময়মতো দিতে না পারলে জরিমানা; নমিনি ব্যবস্থার লিখিত প্রমাণ রাখতে হবে। |
| বিদেশি বিনিয়োগকারী | হোল্ডিং কোম্পানির স্তর পেরিয়ে চূড়ান্ত ব্যক্তি মালিকের তথ্য দিতে হতে পারে; ব্যাংক ও বিডার কাগজের সঙ্গে মিল রাখতে হবে। |
| ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান | কেওয়াইসি যাচাইয়ে RJSC-এর সরকারি তথ্য পাওয়া সহজ হবে; ঋণ দেওয়ার আগে প্রকৃত মালিক শনাক্তে সুবিধা। |
| নিয়ন্ত্রক সংস্থা | বিএফআইইউ, দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইনানুগ অনুরোধে মালিকানার তথ্য পেতে পারবে (সেপ্টেম্বরের খসড়া অনুযায়ী)। |
সব মিলিয়ে, যাঁরা নিয়ম মেনে ব্যবসা করেন তাঁদের জন্য এই কোম্পানি আইন সংশোধন বাড়তি বোঝা নয়, বরং আস্থার প্রমাণ। ঝুঁকিতে পড়বেন মূলত তাঁরা, যাঁদের শেয়ারের কাগজ, হস্তান্তর দলিল বা নমিনি চুক্তি অসম্পূর্ণ, কিংবা যাঁরা বছরের পর বছর RJSC-তে বার্ষিক রিটার্ন জমা দেননি। তাই আইন পাসের অপেক্ষা না করে এখনই একবার কোম্পানির পুরো মালিকানা কাঠামো পর্যালোচনা করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ কোম্পানি আইন বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন, যাতে চূড়ান্ত বিধিমালা ও RJSC-এর নতুন ফরম প্রকাশিত হলে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে ঘোষণা দেওয়া যায়।
৭. কোম্পানি আইন সংশোধন এখন কোন ধাপে

- খসড়া প্রকাশ (সেপ্টেম্বর ২০২৬): বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মতামতের জন্য খসড়া প্রকাশ করে।
- অংশীজন সভা (৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬): এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সভা; ব্যবসায়ীদের লিখিত মতামত দেওয়ার সময় দেওয়া হয়।
- আন্তমন্ত্রণালয় সভা: প্রথম আলোর ২৬ অক্টোবর ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে বাণিজ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এই সভা হওয়ার কথা।
- মন্ত্রিসভার অনুমোদন: চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভায় উঠবে।
- আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং: আইনি ভাষা ও সামঞ্জস্য যাচাই।
- জাতীয় সংসদে পাস: এরপর RJSC বিধি, ফরম ও নির্দেশনা জারি করবে।
৮. কোম্পানির মালিক ও উদ্যোক্তাদের করণীয়
এখনই নতুন কোনো ফরম জমা দেওয়ার দরকার নেই। তবে কোম্পানি আইন সংশোধন কার্যকর হওয়ার আগেই নথিপত্র গুছিয়ে রাখলে পরে ঝামেলা কম হবে:
- রেজিস্টার হালনাগাদ রাখুন: সদস্য, পরিচালক, শেয়ার বরাদ্দ ও হস্তান্তরের তথ্য।
- মালিকানার শৃঙ্খল চিহ্নিত করুন: প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব মালিকের তালিকা করুন, একেবারে শীর্ষের ব্যক্তি পর্যন্ত।
- নমিনি ব্যবস্থার নথি রাখুন: অন্যের পক্ষে রাখা শেয়ারের জন্য লিখিত নমিনি চুক্তি বা ট্রাস্ট ঘোষণা রাখুন।
- শেয়ার হস্তান্তরের কাগজ সম্পূর্ণ করুন: হস্তান্তর দলিল, স্ট্যাম্প শুল্ক ও RJSC-তে দাখিল ঠিক আছে কি না দেখুন।
- বকেয়া RJSC দাখিল শেষ করুন: বাকি থাকলে RJSC বার্ষিক রিটার্ন (শিডিউল-১০) ও অন্যান্য RJSC ফরম জমা দিন।
- সংঘস্মারক (MOA) ও সংঘবিধি (AOA) পর্যালোচনা করুন: বর্তমান ব্যবসা উদ্দেশ্য অনুচ্ছেদের বাইরে কি না দেখুন।
- কর ও ব্যাংকের তথ্য মিলিয়ে নিন: এনবিআর, ব্যাংক ও RJSC-তে দেখানো মালিকের তথ্য যেন এক থাকে। প্রাসঙ্গিক: ব্যাংক হিসাবে BIN বাধ্যতামূলক।
- চূড়ান্ত আইন অনুসরণ করুন: সময়সীমা ও জরিমানা এখনো প্রস্তাব মাত্র; গেজেট দেখে তবেই পদক্ষেপ নিন।
৯. যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
- সদস্য রেজিস্টারে যাঁর নাম, তিনিই সব সময় প্রকৃত মালিক ধরে নেওয়া।
- লিখিত চুক্তি ছাড়া মুখে মুখে নমিনি ব্যবস্থা রাখা।
- বিদেশি হোল্ডিং কোম্পানি বা পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ উপেক্ষা করা।
- শেয়ার হস্তান্তর RJSC-তে নিবন্ধন না করা।
- খসড়ার জরিমানাকে চূড়ান্ত আইন মনে করা।
১০. কোম্পানি আইন সংশোধন: সাধারণ প্রশ্নোত্তর
কোম্পানি আইন সংশোধন কি কার্যকর হয়েছে?
প্রকৃত মালিক (Beneficial Owner) কে?
মালিকানা পরিবর্তনের ঘোষণা কত দিনের মধ্যে দিতে হবে?
তথ্য প্রকাশ না করলে জরিমানা কত?
সংঘস্মারক সংশোধনে কি আর আদালতে যেতে হবে?
এক ব্যক্তির কোম্পানি কি আগে থেকেই আছে?
বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিতেও কি এটি প্রযোজ্য হবে?
উপসংহার
কোম্পানির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, ডিজিটাল নিবন্ধন এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর ক্ষেত্রে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। আইনটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর হলে মালিকানা-সংক্রান্ত স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনাও সহজ হবে। তাই কোম্পানির মালিক, পরিচালক ও বিনিয়োগকারীদের এখন থেকেই নথিপত্র গুছিয়ে রাখা উচিত।
কোম্পানি আইন সংশোধনের প্রস্তুতিতে সহায়তা প্রয়োজন?
ভ্যাটক্স অ্যাডভাইজরি অ্যান্ড কোং আপনার শেয়ারধারণ, নমিনি ব্যবস্থা ও RJSC দাখিল পর্যালোচনা করে নতুন বিধান আসার আগেই রেকর্ড হালনাগাদ করে দেয়। কোম্পানি নিবন্ধন, RJSC সেবা, আয়কর, ভ্যাট ও কমপ্লায়েন্স রিটেইনার—সব এক জায়গায়।
আরও পড়ুন
- বাংলাদেশে কোম্পানি নিবন্ধন
- RJSC বার্ষিক রিটার্ন দাখিল
- RJSC-এর ২৫টি প্রয়োজনীয় ফরম
- কোম্পানির নাম পরিবর্তন
- অংশীদারি ফার্ম নিবন্ধন
- কমপ্লায়েন্স রিটেইনার সেবা
সূত্র: কোম্পানী আইন, ১৯৯৪ (বাংলাদেশ আইন); প্রথম আলো, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; বাংলা বার্তা, ২৬ অক্টোবর ২০২৬; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬। দায়মুক্তি: এই লেখা প্রস্তাবিত খসড়া আইনের প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ তথ্য; আইনি পরামর্শ নয়। পদক্ষেপ নেওয়ার আগে চূড়ান্ত আইন ও RJSC-এর বিধি দেখে নিন বা পেশাদার পরামর্শ নিন।



গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কোম্পানি আইন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে লেখাটি বেশ সহায়ক।
ধন্যবাদ
নাসিরুল হাসান